About
About
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকেই আব্দুল্লাপুর উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়টির গোড়া পত্তন। বিংশ শতাব্দীর ঊষা লগ্ন থেকে শুরু হয় এর শেকড় বিস্তৃত ও বদ্ধমূল করণের দায়িত্ব। প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষানুরাগী, বিত্তবান ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহলের আন্তরিক নিষ্ঠার ফসল হিসেবেই বিদ্যালয়ের পরিচর্যা, পরিবর্ধন অনুশীলন দিনে দিনে বিকশিত হয়ে সুপ্রসিদ্ধ এক শিক্ষানিকেতন হিসেবে এর খ্যাতি ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্রমপুরের গোটা পরিসরে। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্রতী, নিবেদিতপ্রাণ কিছু মানুষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে বুকে আগলে ধরেন, যার ফলশ্রুতিতে মহামূল্যবান বিদ্যারত্ন একে একে বের হয়ে আসতে শুরু করেছিল। জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই বিদ্যালয় ধ্বংসের পায়তারা নানা সময়ে নানা ভাবে একটি চিরপরিচিত ও চিহ্নিত মহল শুরু থেকেই করে আসছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কালের বিবর্তনের ধারায় অগণিত পর্বত প্রমাণ বাধার তিমির অতিক্রম করেই আজ এই পবিত্র বিদ্যাঙ্গনটি তার শতাব্দী উদযাপন পর্যন্ত সময়ের এই মহতী শুভক্ষণটিতে এসে দাঁড়ালো। পরিশেষে সত্য ও সুন্দরের জয় হলো, এটাই ইতিহাসের ক্রমবিবর্তনের অবিচ্ছেদ্য প্রবাহ। অনন্য সাধারণ মেধা আর জ্ঞান পিপাসাকাতর কিছু বিদ্যারত্ন প্রসব করেছে এই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। যেমন বলা যায় শ্রী গৌরী শঙ্কর বণিক। অবিভক্ত ভারতের তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সর্বোচ্চ মেধা তালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করে পূর্বসূরী ছাত্র হিসাবে আজও অম্লান ও চির ভাস্বর হয়ে আছেন।
আমাদের পার্শ্ববর্তী থানা মুন্সীগঞ্জ মহকুমাধীন (তৎকালীন) রামপাল ইউনিয়ন নিবাসী জনাব মোঃ তোফাজ্জল ও মোফাজ্জল হোসেন এই বিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হিসেবে বৃটিশ শাসিত তৎকালীন ভারতবর্ষের শাসক-প্রশাসক শ্রেণীর ভূয়সী প্রশংসাভাজন ব্যক্তিত্বে ' চিহ্নিত হয়েছিলেন। তোফাজ্জল ও মোফাজ্জল হোসেনের স্নেহময়ী জননীকে বৃটিশ সরকার সে সময়ে “রত্নগর্ভা” উপাধীতে ভূষিত করেছিল। এই প্রয়াত মাতাকে আজ পরম ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জানানোর এটাই মোক্ষম সময় বলে আমরা মনে করি। জনাব মোঃ ইকবাল হোসাইন, আজ যিনি প্রফেসর ডঃ এ কে এম ইকবাল হোসাইন নামেই গুণী, জ্ঞানী ও সুধী মহলে সমধিক শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে পরিচিত। তিনিও এই বিদ্যালয়ের একজন কৃতী মেধাবী ছাত্র হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। তিনি ইউনির্ভার্সিটি অব লন্ডন থেকে পি এইচ ডি করে পরবর্তী সময়ে বুয়েটে সহকারী অধ্যাপক, যান্ত্রিক প্রকৌশলী রূপে পরিচালক, বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজি, চট্টগ্রাম, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনিক্যাল এসিস্ট্যান্টস সেন্টার (বিটাক), শিল্প মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার-এর দায়িত্বে ছিলেন এবং বর্তমানে প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন, এনার্জি এন্ড এনভায়রনমেন্ট সেন্টার (ই ই সি), ইসলামিক ইনিস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আই আই টি) ঢাকা, বাংলাদেশে (ও আই সি)র মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে । তিনিও ঢাকা বোর্ডের অধীনে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান অধিকার করেছিলেন। জনাব এম ইদ্রিস আলী, সিএসপি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন সুদক্ষ সচিব হিসেবে। একসময় তিনি পি এম সি, উপ-সচিব এবং যুগ্ম সচিবের দায়িত্বও অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে পালন করেছেন। তিনিও এই বিদ্যালয়েরই একজন অনন্য মেধাবী ছাত্র হিসেবে বিদ্যালয়ের গৌরব বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছেন। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে একজন সুদক্ষ এবং সম্মানিত সাংসদ হিসেবে জাতীয় সংসদে এই এলাকার আসন (জাতীয় ১৭৮, জেলা ভিত্তিক ৩)- এ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন সকলের প্রিয়ভাজন ব্যক্তিত্ব জনাব এম শামছুল ইসলাম। যিনি ইতোপূর্বের সরকার আমলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন- তথ্য ও বাণিজ্য, খাদ্য ও টেলিযোগাযোগ এবং স্বল্প সময়ের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনিও এ বিদ্যালয়ের ছাত্র এবং আব্দুল্লাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র কল্যাণ পরিষদের সম্মানিত আজীবন সদস্য পদে বহাল রয়েছেন।
জনাব আলহাজ্জ্ব মোঃ আরশাদ আলী একজন গর্বিত ছাত্র হিসেবে এ বিদ্যালয় থেকেই শুরু করেন তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের ভিত্তি স্থাপনা। তিনি দি মার্চেন্ট লিঃ (ফ্লাক্সিবল প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ) এর মহাপরিচালক এবং এলিট প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজেস গ্রুপ-এর মহাপরিচালক রূপে দায়িত্বে রয়েছেন এবং বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানাগার ভবন তার অর্থানুকুল্যে নির্মিত হয়েছে। ডঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন, এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে কর্মরত থাকাকালে জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলো হিসেবে যোগদান করেন। ডঃ অধ্যাপক আবুল বাসার কৃতী ছাত্র হিসেবে এই বিদ্যালয়ের সূতিকাগার থেকে বেরিয়ে বৃহত্তম কর্মময় জীবনে প্রবেশ করেন। তিনি বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন প্রিন্সিপাল (ইন চার্জ) হিসেবে টেকনিক্যাল টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, তেজগাঁও, ঢাকা। সে সাথে ফ্যাকাল্টি অব এডুকেশন, ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা-এর একজন সম্মানিত ডিন হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। জনাব মঞ্জুরুল আলম দুলাল, তিনি এই বিদ্যালয়ের একজন কৃতী ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করেন। সুখ্যাত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান প্রাণ লিঃ-এর তিনি স্বত্ত্বাধিকারী। মিরপুর জাতীয় স্টেডিয়ামটি যিনি স্বীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তদারকী করে সময়ে সর্বতোভাবে সহয়তা করেছেন বলে এই উ নির্মাণকালীন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে নিয়ে গর্ব অনুভব করে থাকে। শ্রী জগবন্ধু বসাক, এসিস্ট্যান্ট ইকোনোমিক এ্যাডভাইজার, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কর্মরত একজন প্রাক্তন কৃতী ছাত্র। এই ভূ বিদ্যালয়ই তাকে আজ খ্যাতির শীর্ষে উঠতে সাহায্য করেছে। জনাব আলহাজ্জ্ব হাবিবুর রহমান মোল্লা এ বিদ্যালয়ের অপর এক কৃতী ছাত্র। বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা ও সংগঠনের মাধ্যমে আজ এক সফল গ্রুপ অব কোম্পানিজ-এর অন্যতম ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছেন। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দুর্যোগময় মুহূর্তে এই সমাজসেবী দানবীর নানা ভাবে বিদ্যালয়ের কল্যাণ কর্মে নিজেকে জড়িত করেছেন। বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের দুটি কক্ষ তিনি পুনঃসংস্কার ও নির্মাণ কাজে সহায়তা করে প্রতিষ্ঠানটি শ্রী বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছেন। তিনিও একজন স্থায়ী দাতা সদস্য হিসেবে বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কর্মকান্ডে জড়িত আছেন। জনাব এম মনিরুজ্জামান বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান, তিনি সানফ্লাওয়ার কোল্ড ষ্টোরেজ এবং বেঙ্গল এ্যায়ার সার্ভিসেস এর স্বত্ত্বাধিকারী, সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক। জনাব মোঃ মোশাররফ হোসেন পুস্তি, এই বিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র এবং একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে তিনি কৃষি নির্ভর বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা এবং শিল্পপতি হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশন (বি এফ এ)-এর ফাইন্যান্স ডাইরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যালয়ের দুঃসময়ে একজন বিশ্বস্ত সহযোগীরূপে তার অবদান এই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গভীরভাবে অনুভব করে। জনাব মোঃ আমীর হোসেন সরকার, এই বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন । বর্তমানে জনসংখ্যা উন্নয়ন ব্যুরোতে উপ-সহকারী পরিচালক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এলাকায় শিক্ষা বিস্তারের মহতী উদ্যোগের সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। সরোয়ার মোর্শেদ মোল্লা, অষ্টম মান পর্যন্ত এই বিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাপনান্তে ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা সমাপ্ত করার পর মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সফলতা লাভ করে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় একজন নেভাল কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। মিসেস রওশন আহমেদ রুমি, আব্দুল্লাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুল সার্টিফিকেট অর্জনের পর গ্রেট ব্রিটেনে স্বামী সংসার পুত্র কন্যা নিয়ে লন্ডনে ইমিগ্রেন্ট জীবন যাপন করছেন সুদীর্ঘ সময় ধরে। রুমি সেখানে একজন “চাইন্ড মাইন্ডার" হিসেবে চাকুরীতে নিযুক্ত রয়েছেন। একজন বাঙ্গালী মহিলা হিসেবে ইংরেজদের কাছে তিনি যতটা না পরিচিতা, তার চাইতে বেশী পরিচিতা একজন আদর্শ প্রাইমারি শিক্ষিকা হিসেবে। এই বিদ্যালয় তাকে নিয়ে গর্ব বোধ করে। উল্লেখিত কতিপয় ব্যক্তি ছাড়াও এই বিদ্যালয় তার গত শতাব্দীর গোটা ইতিহাস জুড়ে আত্মনিবেদিত বহু জানা ও অজানা জ্ঞানী- গুণী এবং সুধী সফল ছাত্রের জীবন বিনির্মানে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। যাদের নাম ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস সংগ্রহ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি বলে ভিক্ষা করছি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি, গঠনমূলক সমালোচনা, যেন পরবর্তী প্রজন্ম এসে এই অপারগতার দায়ভার থেকে মুক্ত করে গৌরবোজ্জ্বল এই প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তপ্রায় হারানো ইতিহাস ও ঐতিহ্য। আব্দুল্লাপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত অগণিত সংখ্যক কীর্তিমান ছাত্র-ছাত্রীদের কঠিন বাস্তব জীবন একজন লড়াকু সৈনিক রূপে গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কি স্বদেশে, কি প্রবাসে যেখানেই আণুবীক্ষনিক দৃষ্টি দিয়ে অনুসন্ধান করা যাবে সেখানেই যত্র তত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিদ্যালয়ের গর্বের ধন সেসব সোনার ছেলেরা যারা এর গৌরব বৃদ্ধিতে এতটুক কার্পণ্য করেনি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, কোরিয়াতে যেমন তেমনি আফ্রিকা সহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু স্থানে কর্ম ব্যাপাদেশে অবস্থান করছেন আব্দুল্লাপুরের এই বিদ্যাপীঠের সূতিকাগারে জন্ম নিয়ে। শতবর্ষ উদযাপনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আজকের প্রশাসন, শিক্ষকমন্ডলী, ছাত্র-ছাত্রী, অভিভাবকমন্ডলী এবং অগণিত শুভানুধ্যায়ীদের আমরা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছি। আর বেদনাহত চিত্তে স্মরণ করতে হয় এই বিদ্যালয়ের জন্ম ইতিহাস থেকে সংশ্লিষ্ট ঐসব স্মরণীয় ও বরণীয়দের যারা নিরলস শ্রম মেধা অর্থ ও নানা রকম সহায়তা দিয়ে এই পবিত্র বিদ্যাভূমি আজ আর এই সেবা যত্নে আন্তরিকতায় ভরে দিয়েছেন অথচ মহতী ক্ষণে আমাদের সাথে মিলিত হয়ে তারা উদ্যাপন করতে পারলেন না শতবর্ষকে।